নারী এশিয়া কাপ ২০২৬-এ হংকংয়ের বিপক্ষে ভারতের বড় জয়ের অন্যতম নায়ক হয়ে উঠলেন স্মৃতি মান্ধানা। ভারতীয় ওপেনারের দুর্দান্ত ব্যাটিং শুধু দলকে বড় স্কোর এনে দেয়নি, তাঁকে নারী আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের রেকর্ড বইয়েও নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। ৬৪ বলে ১২৪ রানের অসাধারণ ইনিংসে মান্ধানা ১৪টি চার ও ৭টি ছক্কা মারেন।
এই বিধ্বংসী শতকের সুবাদে একসঙ্গে একাধিক বড় মাইলফলক স্পর্শ করেন ভারতের তারকা ব্যাটার। মিতালি রাজকে পেছনে ফেলে নারী আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন তিনি। পাশাপাশি ১৮টি আন্তর্জাতিক শতক নিয়ে শতকের সংখ্যাতেও নতুন রেকর্ড গড়েন মান্ধানা। তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি ভারত ১৩৭ রানের বড় জয় পেয়ে এশিয়া কাপের সেমিফাইনালও নিশ্চিত করে।
৬৪ বলে ১২৪ মান্ধানার ব্যাটে বিধ্বংসী শতক
হংকংয়ের বিপক্ষে টস জিতে প্রথমে ব্যাট করে ভারত। শুরুতেই স্মৃতি মান্ধানা ও শেফালি ভার্মা আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করে ৪৭ বলে ৭৪ রানের জুটি গড়েন। শেফালি আউট হওয়ার পরও এক প্রান্ত ধরে রাখেন মান্ধানা। অন্য ব্যাটাররা হংকংয়ের বোলিংয়ের বিপক্ষে বড় রান করতে না পারলেও তিনি নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাটিং চালিয়ে যান। ৬৪ বলে ১২৪ রানের ইনিংসে মান্ধানা মারেন ১৪টি চার ও ৭টি ছক্কা। ইনিংসের শেষ পর্যন্ত ক্রিজে থেকে ডেথ ওভারে আরও আক্রমণাত্মক হন এবং ১৮তম ওভারে টানা তিনটি ছক্কা হাঁকান। তাঁর দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে ভারত ২০ ওভারে ৫ উইকেটে ১৯৩ রান করে। অন্য কোনো ভারতীয় ব্যাটার ১১ রানের বেশি করতে পারেননি, ফলে দলের স্কোরে মান্ধানার অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মিতালি রাজকে পেছনে ফেলে নারী আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক
হংকংয়ের বিরুদ্ধে ব্যাট করতে নামার সময় মান্ধানা নিজেও জানতেন না যে এই ম্যাচেই তিনি একটি ঐতিহাসিক রেকর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। ম্যাচ শেষে তিনি জানান, মিতালি রাজকে পেছনে ফেলতে ঠিক কত রান দরকার, সে সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা ছিল না। কিন্তু ১২৪ রানের ইনিংস শেষ হতেই হিসাব বদলে যায়। তিন ফরম্যাট মিলিয়ে মান্ধানার মোট রান দাঁড়ায় ১০,৮৮০। এর আগে এই রেকর্ডের মালিক ছিলেন ভারতের কিংবদন্তি মিতালি রাজ, যাঁর আন্তর্জাতিক রান ছিল ১০,৮৬৮।
অর্থাৎ মাত্র ১২ রানের ব্যবধানে মিতালিকে ছাড়িয়ে নারী আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন মান্ধানা। এই অর্জন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ মিতালি দীর্ঘদিন ভারতীয় নারী ক্রিকেটের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন এবং তাঁর ব্যাটিং রেকর্ড বহু বছর ধরে অটুট ছিল। মান্ধানার এই রেকর্ড ভারতীয় নারী ক্রিকেটের ধারাবাহিক সাফল্যেরও প্রতীক। একই দেশের দুই কিংবদন্তি ব্যাটার এখন নারী আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকদের তালিকায় শীর্ষ দুই স্থানে রয়েছেন।
১৮টি আন্তর্জাতিক শতক
রানের রেকর্ড ভাঙার পাশাপাশি শতকের সংখ্যাতেও নতুন মাইলফলক গড়েছেন স্মৃতি মান্ধানা। হংকংয়ের বিপক্ষে ১২৪ রানের ইনিংসটি ছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর ১৮তম শতক, যা তাঁকে নারী আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বাধিক শতকের মালিক করেছে।এর আগে অস্ট্রেলিয়ার মেগ ল্যানিং ও দক্ষিণ আফ্রিকার লরা ভলভার্টের নামে ছিল ১৭টি করে আন্তর্জাতিক শতক। মান্ধানার ১৮তম শতক তাঁদের পেছনে ফেলে দেয়।
তিন ফরম্যাটেই শতরান করার কৃতিত্ব রয়েছে মান্ধানার। তাঁর ১৪টি ওয়ানডে, দুটি টেস্ট ও দুটি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক শতক রয়েছে। ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, বিশেষ করে টি-টোয়েন্টিতে উন্নতি, তাঁকে নারী ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ব্যাটারে পরিণত করেছে।
কঠিন পরিবেশেও শেষ পর্যন্ত ব্যাট করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখেন
দুবাইয়ের গরম ও আর্দ্র পরিবেশে দীর্ঘ সময় ব্যাটিং করা সহজ ছিল না। ম্যাচের পর মান্ধানাও স্বীকার করেন, পরিস্থিতি বেশ কঠিন ছিল। এর মধ্যেও তিনি প্রায় দেড় ঘণ্টা ক্রিজে কাটান। ওপেনিং জুটি ভেঙে যাওয়ার পর ভারতের মিডল অর্ডার প্রত্যাশামতো রান তুলতে পারেনি। ৩ থেকে ৭ নম্বর ব্যাটাররা ৩৯ বলে মাত্র দুটি চার মারেন, ফলে ইনিংসের ভার মূলত মান্ধানার ওপরই পড়ে।
তবে চাপের মধ্যেও তিনি নিজের ব্যাটিংয়ের ধরন বদলাননি। শুরুতে স্ট্রাইক রোটেট করার পাশাপাশি সুযোগ পেলেই বাউন্ডারি মারেন এবং শেষদিকে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। তাঁর ইনিংসের শেষ অংশেই ভারতের স্কোর দ্রুত বাড়তে থাকে। মান্ধানার এই ইনিংস শুধু তাঁর ব্যক্তিগত দক্ষতার পরিচয় নয়, বরং কঠিন পরিস্থিতিতে একজন অভিজ্ঞ ব্যাটার কীভাবে নিজের ইনিংস গড়ে তুলতে পারেন, তারও উদাহরণ।
মান্ধানার শতকের পর ভারতের ১৩৭ রানের বড় জয় ও সেমিফাইনাল নিশ্চিত
ব্যাট হাতে মান্ধানার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর বল হাতেও দারুণ খেলেছে ভারত। ১৯৪ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে হংকংয়ের ব্যাটাররা ভারতীয় বোলারদের সামনে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেননি।
ভারতের হয়ে দীপ্তি শর্মা মাত্র ৯ রান দিয়ে তিনটি উইকেট নেন। নন্দিনী শর্মা, প্রেমা রাওয়াত ও শ্রী চরণী দুটি করে উইকেট তুলে নিয়ে হংকংকে চাপে রাখেন।
ফলে ভারত ১৩৭ রানের বড় জয় পায়। এশিয়া কাপ ২০২৬-এ এটি ছিল ভারতের টানা দ্বিতীয় জয়, যার ফলে তারা গ্রুপ ‘এ’-এর শীর্ষে উঠে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে।মান্ধানার রেকর্ড গড়া শতক ও বোলারদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে হংকংয়ের বিপক্ষে ম্যাচটি ভারতের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকে।
মূল্যায়ন
স্মৃতি মান্ধানার ৬৪ বলে ১২৪ রানের ইনিংস নারী আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে। এই ইনিংসে তিনি ভারতকে বড় স্কোর এনে দেওয়ার পাশাপাশি দুটি বড় মাইলফলক অর্জন করেন।মিতালি রাজকে পেছনে ফেলে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হওয়া এবং ১৮টি আন্তর্জাতিক শতকের রেকর্ড গড়া তাঁর ধারাবাহিক সাফল্যের প্রমাণ। তবে মান্ধানা নিজেই মনে করেন, এটি কেবল শুরু। সামনে আরও রেকর্ড ভাঙার সুযোগ রয়েছে এই তারকা ওপেনারের।














