ভারতীয় ক্রিকেটে বীরেন্দ্র শেহবাগ ও রাহুল দ্রাবিড় দুটি নামই এক বিশেষ যুগের প্রতিনিধিত্ব করে। একজন ছিলেন আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের প্রতীক, অন্যজন ধৈর্য ও নির্ভরতার প্রতিচ্ছবি। এবার তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন আগ্রহ। শেহবাগের ছেলে আর্যাবীর ও দ্রাবিড়ের ছোট ছেলে অন্বয় অস্ট্রেলিয়া অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিরুদ্ধে সিরিজের জন্য ভারত অনূর্ধ্ব-১৯ দলে জায়গা পেয়েছেন। ১৮ সেপ্টেম্বর রাজকোটে শুরু হবে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ, যেখানে দুই তরুণের পারফরম্যান্স ঘিরে থাকবে বাড়তি কৌতূহল।
প্রথমবার ভারত অনূর্ধ্ব-১৯ দলে আর্যাবীর শেহবাগ
আর্যাবীর শেহবাগের জন্য এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে আসন্ন সিরিজেই প্রথমবার ভারত অনূর্ধ্ব-১৯ দলের জার্সি পরার সুযোগ পেতে চলেছেন তিনি। ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান ইতিমধ্যেই ঘরোয়া বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে নিজের প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের কুচবিহার ট্রফিতে মেঘালয়ের বিরুদ্ধে তাঁর ২৯৭ রানের দুর্দান্ত ইনিংস তাঁকে ক্রিকেটমহলে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
সেখানেই থেমে থাকেননি আর্যাবীর। সম্প্রতি দিল্লি প্রিমিয়ার লিগ ২০২৬-এ ওয়েস্ট দিল্লি লায়ন্সের হয়ে সিনিয়র ক্রিকেটেও তাঁকে দেখা গেছে। সেখানে তাঁর আক্রমণাত্মক স্ট্রোকপ্লে নজর কেড়েছে এবং শট খেলার ধরন অনেককেই তাঁর বাবা বীরেন্দ্র শেহবাগের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।
তবে বাবার সঙ্গে এই তুলনা আর্যাবীরের জন্য যেমন বাড়তি পরিচিতি এনে দিচ্ছে, তেমনই বাড়াচ্ছে প্রত্যাশাও। তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি শুধু কিংবদন্তি বাবার ছেলে নন, নিজের প্রতিভাতেও ভারতীয় ক্রিকেটে জায়গা করে নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।
অন্বয় দ্রাবিড়ের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স
আর্যাবীরের তুলনায় অন্বয় দ্রাবিড়ের ভারত অনূর্ধ্ব-১৯ দলের পথচলা কিছুটা এগিয়ে। উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান হিসেবে ইতিমধ্যেই তিনি জাতীয় বয়সভিত্তিক দলের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। চলতি বছরের জুলাইয়ে শ্রীলঙ্কা সফরে ভারত অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে তাঁর পারফরম্যান্স বিশেষভাবে নজর কেড়েছিল।
শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে একটি ওয়ানডেতে অন্বয় ৬৭ বলে ৮৭ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন। সেই ইনিংসে ছিল নয়টি চার ও একটি ছক্কা। ৮১ রানে চার উইকেট হারিয়ে চাপে পড়া ভারতকে তিনি অর্জুন রাজপুতের সঙ্গে ১৪৫ রানের জুটি গড়ে ম্যাচে ফেরান। এই ইনিংস তাঁর চাপের পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতাও তুলে ধরে।
এর আগে কর্ণাটক অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়েও অন্বয় নিয়মিত পারফর্ম করেছেন এবং দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিনু মানকড় ট্রফিতে ছয় ম্যাচে তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে ২২০ রান, গড় ৫৫। হিমাচল প্রদেশের বিরুদ্ধে অপরাজিত ৮২ রানের ইনিংসও দলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ফলে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সিরিজে তাঁর কাছ থেকেও ভালো পারফরম্যান্সের প্রত্যাশা থাকবে।
একই ভারতীয় দলে ফিরল শেহবাগ ও দ্রাবিড়
আর্যাবীর ও অন্বয়ের একই ভারতীয় দলে থাকা শুধুমাত্র তাঁদের ব্যক্তিগত কেরিয়ারের জন্য নয়, ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসের দিক থেকেও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁদের বাবা বীরেন্দ্র শেহবাগ ও রাহুল দ্রাবিড় দীর্ঘ সময় ভারতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন এবং একসঙ্গে দেশের হয়ে বহু স্মরণীয় ম্যাচ খেলেছেন।
বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দুই কিংবদন্তির পারফরম্যান্স ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। ২০০১ সালের কলকাতা টেস্টে রাহুল দ্রাবিড়ের ১৮০ রান ভারতের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অস্ট্রেলিয়ার টানা ১৬ টেস্ট জয়ের ধারাও সেই সিরিজে থেমেছিল।
এর কয়েক বছর পর ২০০৩-০৪ সালের অস্ট্রেলিয়া সফরেও দ্রাবিড় দুর্দান্ত ব্যাটিং করেন। পুরো সিরিজে ৬১৯ রান করে তিনি সিরিজের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। একই সফরে বীরেন্দ্র শেহবাগও তাঁর আক্রমণাত্মক ব্যাটিং দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের চাপে ফেলেছিলেন। ফলে একই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এবার তাঁদের ছেলেদের যাত্রা শুরু হওয়া স্বাভাবিকভাবেই একটি বিশেষ গল্প তৈরি করেছে।
অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে কঠিন পরীক্ষার সামনে দুই তরুণ
আর্যাবীর ও অন্বয়ের জন্য সামনে থাকা সিরিজটি সহজ পরীক্ষা হবে না। অস্ট্রেলিয়ার অনূর্ধ্ব-১৯ দল বরাবরই বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার জন্য এই সিরিজ দুই ক্রিকেটারের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে তিনটি ওয়ানডে অনুষ্ঠিত হবে রাজকোটে। ম্যাচগুলো হবে ১৮, ২১ ও ২৩ সেপ্টেম্বর। এরপর রয়েছে দুটি বহুদিনের ম্যাচ। প্রথমটি ২৭ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর রাজকোটে এবং দ্বিতীয়টি ৫ থেকে ৮ অক্টোবর আহমেদাবাদের বি গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হবে।
তবে আর্যাবীর ও অন্বয়কে শুধুমাত্র ওয়ানডে স্কোয়াডে রাখা হয়েছে। বহুদিনের ম্যাচের দলে তাঁদের রাখা হয়নি। ওয়ানডে দলে ভারতের অধিনায়ক থাকবেন লক্ষ্য রাইচান্দানি এবং তাঁর ডেপুটি যশবর্ধন চৌহান। অন্যদিকে বহুদিনের ম্যাচে যশবর্ধন অধিনায়ক এবং লক্ষ্য রাইচান্দানি সহ-অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করবেন।
বাবাদের ছায়া পেরিয়ে নিজেদের পরিচয় তৈরির চ্যালেঞ্জ
আর্যাবীর ও অন্বয়ের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে ভালো খেলা নয়, বরং নিজেদের ওপর থাকা অতিরিক্ত প্রত্যাশা সামলানো। তাঁদের প্রতিটি বড় পারফরম্যান্সের পরই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠবে, তাঁরা কতটা তাঁদের কিংবদন্তি বাবাদের মতো?
আর্যাবীরের আক্রমণাত্মক ব্যাটিং ইতিমধ্যেই তাঁকে শেহবাগের সঙ্গে তুলনার মধ্যে এনেছে। অন্যদিকে অন্বয়ের ব্যাটিং ও উইকেটকিপিংয়েও তাঁর বাবার ক্রিকেটীয় উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে তাঁদের কেরিয়ার এখনও শুরুর পর্যায়ে। তাই বাবাদের সঙ্গে তুলনার বদলে এই সিরিজে নিজেদের খেলার ধরন ও দক্ষতা প্রতিষ্ঠা করাই তাঁদের জন্য বড় সুযোগ।
মূল্যায়ন
আর্যাবীর শেহবাগ ও অন্বয় দ্রাবিড়ের ভারত অনূর্ধ্ব-১৯ দলে নির্বাচন নতুন প্রজন্মের আগমনের একটি আকর্ষণীয় মুহূর্ত। দুই কিংবদন্তি ক্রিকেটারের ছেলেদের একই দলে থাকা বাড়তি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে তাঁদের মূল চ্যালেঞ্জ হবে বাবাদের পরিচিতির বাইরে গিয়ে নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করা।
অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে রাজকোটের ওয়ানডে সিরিজ সেই পথচলার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বাবারা যেমন অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে স্মরণীয় অধ্যায় লিখেছিলেন, এবার তাঁদের ছেলেদের সামনে রয়েছে নিজেদের গল্প শুরু করার সুযোগ।
Meta Description:
অস্ট্রেলিয়া সিরিজের জন্য ভারত অনূর্ধ্ব-১৯ দলে ডাক পেলেন আর্যাবীর শেহবাগ ও অন্বয় দ্রাবিড় তাদের পারফরম্যান্স সহ সমস্ত তথ্য জেনে নিন বিস্তারিত।














